কেন্দ্রবিমুখী বল বলতে কিছু নেই

আপনি যখন বৃত্তাকার পথে ঘোরেন, তখন অনুভব করেন যে, কেউ বা কিছু একটা আপনাকে বৃত্তপথের কেন্দ্র হতে বাইরের দিকে ঠেলে ফেলে দিতে চাচ্ছে। আসলে ব্যাপারটা তা নয়, আপনাকে কোনো কিছু বাইরে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে না, ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অন্য রকম। আমি বলি, বৃত্তের কেন্দ্র হতে আপনার অবস্থান পর্যন্ত যে সংযোজক রেখাংশ, তার বর্ধিতাংশের উপর অবস্থিত কোনো কিছু হয়তো আপনাকে কেন্দ্রের দিকে ঠেলছে।

অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই এজেন্টটা হয়তো বর্ধিতাংশের উপর অবস্থিত নয়, বরং সংযোজক রেখাংশের উপরই অবস্থিত। যেমনঃ ধরুন, আপনি বাসের হাতল (রড) ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। বাস হঠাৎ মোড় ঘোরা শুরু করলো এবং যে বৃত্তপথে এই মোড় ঘুরছে, তার কেন্দ্র আপনি যেদিকে ফেস করে আছেন, সেদিকেই। এক্ষেত্রে আপনি ঠেলা নয়, বরং টান অনুভব করবেন। দৃঢ়হস্তে রড আঁকড়ে থাকার দরুন এই টানবল আপনার হাত তথা প্রকারান্তরে আপনার দেহের উপর প্রযুক্ত হবে।

এবার ঠেলাবলের উদাহরণ দেই। যেমনঃ আপনি যদি বাসে জানালার পাশে বসে থাকেন আর বাসটি যদি এমনভাবে বৃত্তাকার পথে ঘোরে যে, আপনি যে পাশে (বাসের বাম বা ডানের দুই সিটের একটিতে) বসে আছেন তার বিপরীত পাশে হয়তো ঐ বৃত্তের কেন্দ্র। এরূপ ক্ষেত্রে মোড় ঘোরার সময় আপনাকে বাসের বডির সাথে চেপে ধরা হবে। না, অন্য কেউ বা কিছু সেটা করছে না, বরং সেটা ঘটছে নিউটনের গতির প্রথম সূত্রের প্রযোজ্যতা বা সঠিকতার কারণে।

বাসটি বৃত্তাকার পথে না ঘুরলে গতিজড়তার দরুন আপনি ও বাস উভয়ে সোজা সামনের দিকে এগিয়ে যেতেন। উপর্যুক্ত ঠেলা বা টানা বল না থাকলে বৃত্তাকার পথে ঘোরা সম্ভব হতো না আপনার পক্ষে। তাহলে নিশ্চয়ই বলতে চাইবেন, বাসটিও তো বৃত্তাকার পথে ঘুরছে, এর উপর টানা বা ঠেলা বল প্রয়োগ করছে কে? সঠিক উত্তর হলোঃ রাস্তা। কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন, রাস্তা না, গাড়ির ইঞ্জিন। আসলে ইঞ্জিন তথা বাসের চাকা বল প্রয়োগ করে রাস্তার উপর। এটিকে ক্রিয়া বল হিসেবে বিবেচনা করলে বিপরীত দিকে প্রতিক্রিয়া বল প্রযুক্ত হবে, যেটা রাস্তা প্রয়োগ করছে আর প্রযুক্ত হচ্ছে বাসের উপর।

উপর্যুক্ত টানা বা ঠেলা বল হলো কেন্দ্রমুখী বা কেন্দ্রাভিমুখী বল, যা কোনো বস্তু বৃত্তাকার পথে ঘোরার সময় এর উপর বৃত্তের কেন্দ্রের অভিমুখে ক্রিয়া করে। এই (কেন্দ্রমুখী) বল ব্যতীত বৃত্তাকার বা ঘূর্ণন গতি অর্জন সম্ভব নয়। এখন, কেউ কেউ বলতে পারেন, নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রানুসারে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই তো একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। তাহলে কেন্দ্রমুখী বলকে ক্রিয়া হিসেবে ধরে নিলে এর ‘প্রতিক্রিয়া’ বল কোনটি এবং সেটির নাম কী হবে। আসলে, কেন্দ্রমুখী বলেরও একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বল আছে, আর সেটি হলো – যে বস্তুটি বৃত্তাকার পথে ঘুরছে, সেটি রাস্তা বা অন্য কোনো বস্তুর (যেমনঃ বাসের রড বা বডি) উপর যে বল প্রয়োগ করে সেটি। কেন্দ্রমুখী’র সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া বলের নাম ‘কেন্দ্রবিমুখী’ নয়, কারণ ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া বল একই বস্তু বা বস্তুকণার ওপর ক্রিয়া করে না।

মোদ্দা কথা হলো, যত যা-ই বলেন না কেন, কেন্দ্রবিমুখী বল বলতে আসলে কিছু নেই। যখনই বাসটি বা আপনি বৃত্তাকার পথে ঘুরতে শুরু করলেন, তখন আপনাদের দ্রুতি ধ্রুব বা পরিবর্তনশীল যাই হোক না কেন, দিকের কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে, অর্থাৎ বেগের পরিবর্তন হচ্ছে। ‘বেগের পরিবর্তন’ মানে এখানে ত্বরণ ঘটছে। ত্বরণ সৃষ্টি করতে গেলে তো বল লাগে, তাই না? এক্ষেত্রে সেই বলটিই হলো উল্লিখিত ‘কেন্দ্রমুখী বল’।

আমার ওপরোক্ত কনসেপ্ট যদি ঠিক থাকে, তাহলে নিম্নোক্ত কনটেন্টে কনসেপচুয়াল কোনো সমস্যা আছে কি না, সেটা একটু যাচাই করে দেখুন তো।

ইন্টারমিডিয়েটের কোনো একটি টেক্সট বইয়ের একটি পাতা

এই আর্টিক্যালটির ইংরেজি ভার্সনের লিঙ্ক নিচে দেয়া হলোঃ

Centrifugal force: The myths and the reality

Leave a Reply

Your email address will not be published.


CAPTCHA Image
Reload Image